সাম্প্রতিক সময়ে প্রায়ই শোনা যায়—জেল থেকে মুক্তি, তালাকের পর বা মানসিক যন্ত্রণা থেকে বেরিয়ে এসে কেউ কেউ দুধ দিয়ে গোসল করছেন। এসব ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, দুধ দিয়ে গোসলের উদ্দেশ্য কী? আসলেই কি এতে পাপমোচন বা মুক্তিলাভ হয়? আবার প্রাচীনকাল থেকেই কেন এই রীতি চলে আসছে?
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, উপমহাদেশে গরুর দুধ, দই, ঘি ইত্যাদি উপকরণকে পবিত্র মনে করা হতো। বৈদিক যুগ থেকেই বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে দুধ ব্যবহার ছিল প্রচলিত। ব্রাহ্মণদের শুদ্ধিকরণে দুধে স্নান করানো, দেবমূর্তিতে দুধ ঢেলে ‘অভিষেক’ করা ছিল সাধারণ রীতি।
হিন্দু ধর্মে ‘অভিষেক’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিবলিঙ্গে দুধ ঢালা বহু মানুষের কাছে পুণ্য ও শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। জন্মাষ্টমী, মহাশিবরাত্রি, রথযাত্রা, উপনয়ন, বিবাহ কিংবা রাজ্যাভিষেক—এমন বহু আচারেই দুধ ঢেলে স্নান করানো হতো।
প্রাচীন ভারতে নতুন রাজাকে সিংহাসনে বসানোর সময় ‘রাজ্যাভিষেক’-এ দুধ দিয়ে গোসল করানো হতো। এটি ছিল তাকে পবিত্র, শুভ্র ও দেবোত্তম শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রতীক।
শুধু ভারতেই নয়, ইতিহাসে আরও দুধস্নানের নজির পাওয়া যায়।
কথিত আছে, মিসরের রানি ক্লিওপেট্রা ত্বক কোমল রাখতে প্রতিদিন গাধার দুধ দিয়ে গোসল করতেন। রোমান ধনীদের জীবনেও ছিল দুধ, মধু ও গোলাপজলে স্নানের বিলাসিতা।
বর্তমান যুগেও দুধ ঢালার রীতি দেখা যায়। দক্ষিণ ভারতে জনপ্রিয় অভিনেতা বা নেতাদের পোস্টারে ভক্তরা দুধ ঢেলে শ্রদ্ধা জানান। কেউ কেউ মানত, রোগমুক্তি বা আত্মশুদ্ধির প্রতীক হিসেবে দুধ মিশ্রিত পানি দিয়ে গোসল করেন।
তবে এ নিয়ে সমালোচনাও আছে। বিশেষ করে যেখানে দরিদ্র মানুষ দুধের অভাবে অপুষ্টিতে ভোগে, সেখানে দুধ অপচয়ের এই প্রথা কতটা যৌক্তিক—সেই প্রশ্ন ওঠে।
একই সঙ্গে চিকিৎসা দৃষ্টিকোণ থেকেও দুধ-গোসলের কিছু উপকারিতা আছে। ইতিহাস বলছে, রোমানরা ত্বক উজ্জ্বল রাখতে নিয়মিত দুধ মিশ্রিত পানিতে স্নান করতেন। ক্লিওপেট্রার দুধ-মধুর গোসলও ছিল সৌন্দর্য রক্ষার অংশ। আধুনিক গবেষণায়ও দেখা যায়, দুধ মিশ্রিত পানি ত্বকের শুষ্কতা, একজিমা, সোরিয়াসিসের কিছু উপসর্গ কমাতে সহায়ক।
তবে এটি সবার জন্য নিরাপদ নয়। স্পর্শকাতর ত্বকের অধিকারীরা এতে অ্যালার্জিতে ভুগতে পারেন। তাই বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন—ত্বকের সমস্যা থাকলে দুধ দিয়ে গোসলের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

0 Comments